আমার চোখে ভিন্ন এক জিয়া- এম আমিনুল ইসলাম মুনির

জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বই, বিভিন্ন লেখা যখন যা পেয়েছি, পড়েছি। তাঁর নিজের লেখাও পড়েছি, আমি নিজেও তাকে নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে বই আকারে লিখতে শুরু করেছি। শুধু গতানুগতিক পারিবারিক চর্চা থেকেই নয়, জেনে বুঝেও একজন নিখাঁদ দেশপ্রেমিক জিয়াকে ভালবাসতে পেরেছি।
একটা মানুষ মাত্র ৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এত জনপ্রিয় হয় কিভাবে ? রাজনীতি চর্চায় সম্পৃক্ত, তাঁকে পছন্দ অপছন্দের প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মী বা ছাত্রের এবিষয়টিকে অনুধাবন বা গবেষনা করা জরুরী ।

◽জিয়াউর রহমান যখন রাজনীতিতে আসেন তখন রাজনৈতিক নেতারা নিজেদেরকে জনগনের কাছে খুব সাধারন প্রমান করতে হতো। অর্থ বিত্তের মালিক হলেও এবং ঘরে আলিশান চাল চলন বা বিদেশি বেশভূষা, আসবাবপত্র থাকলেও জনগনের কাছে বা মঞ্চে যখন আসতেন তখন সস্তা খদ্দরের বা সাধারণ পাঞ্জাবি পায়জামা পড়ে জনগনকে তার সাদাসিধে জীবনযাপনের মিথ্যা খোলসে আকৃষ্ট করতেন। জিয়াউর রহমান এসেই এই ধারা পাল্টে দিলেন। তিনি বাসায় পড়তেন অতিসাধারণ পাঞ্জাবি লুঙ্গি, খাওয়া দাওয়ায় অতি সাধারন (মৃত্যুর পর তার ব্যবহার্য্য ছেঁড়া পাঞ্জাবিই পাওয়া গেলো।)। কিন্তু অফিসে, বাইরে অসম্ভব স্মার্ট, ড্যাশিং, ফ্যাশনেবল কেতাদুরস্ত একজন রাজনৈতিক নেতা। তার প্রত্যেকটা ছবি যদি খেয়াল করা হয়, সবসময়ই ছিলেন ড্যাম স্মার্ট। বিভিন্ন লেখায় পড়েছি তিনি নিজেকে ভাবতেন একটি স্বনির্ভর ও আধুনিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্র প্রধান। বিশ্বের কাছে এভাবেই নিজেকে উপস্হাপন করতে চাইতেন। দেশের জনগনকেও জরাজীর্ণ অবস্হা থেকে বের করে এনে আত্মবিশ্বাসী জাতিতে পরিণত করতে চাইতেন। নিজের পোশাক পরিচ্ছদকেও রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিকতায় ব্যবহার করেছেন। তার নিকট অতীতে সাবেক রাষ্ট্র প্রধানের সেই “আমি বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে সাহায্য আনি, আর চাটার দলে তা লুটপাট করে ফেলে” বক্তব্যকে আমলে নিয়ে নেমে পড়লেন স্বনির্ভর বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জে। মাত্র ৩ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে গ্রামে গঞ্জে হাটে ঘাটে চষে বেড়িয়েছেন, ১৯ দফা কর্মসূচি, সবুজ বিপ্লব, খাল খনন কর্মসূচি সহ যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপে ভিখারীর অবস্হা থেকে দেশকে সম্পূর্ণ ইউটার্ন করে স্বনির্ভর বাংলাদেশে রূপদান করেছিলেন। ঘরের ভীতর ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরলেও তার ঘরের বাইরের কেতাদুরস্ত পোশাক চালচলন দিয়ে আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশকে রূপায়ন করতেন। মনস্তাত্ত্বিক ভাবে জনগনকে উদ্দীপ্ত করতেন। কী দর্শন ছিলো তার !

◽ বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা রাজনৈতিক নেতা আছে কী-না জানা নেই রাজনীতিতে এসে প্রথম বছরেই দেশের গোটা জাতীয়তাবাদকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিলেন। কী দুর্দান্ত সাহস, কী প্রতিভা। উপলব্ধি করলেন, যেভূখন্ডে পাহাড়ি উপজাতি নৃগোষ্ঠী অবাঙালিরাও জাতিস্বত্বার অংশ সে ভূখণ্ডে বা দেশের জাতীয়তাবাদ বাঙালি হতে পারেনা, বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জাতি অন্য একটি দেশেও বড় একটি অংশ থাকায় শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে এদেশের স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদ প্রকাশ পায়না। তাই দেশের সকল অবাঙালিদেরকে সম্পৃক্ত রেখে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতিস্বত্বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন প্রবর্তন করলেন। যা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র পরিচয়। এখনো কোথাও বাঙালি বলে পরিচয় দিলে প্রশ্ন আসে কোন দেশের বাঙালি, কিন্তু বাংলাদেশী পরিচয় দিলে আমাদের জাতিস্বত্বা একনিমেষেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। প্রথম বছরেই জিয়াউর রহমানের এই উপলব্ধি বিশ্বের কাছে এক দার্শনিক রাষ্টনায়ক হিসেবে তাকে আত্মপ্রকাশ ঘটায় বিশেষ মর্যাদায়।

◽আইনের ছাত্র হিসেবে আমাকে জিয়াউর রহমানের সংবিধান সংশোধনী ও আইনীসংস্কার গুলোও ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়। ৫ম সংশোধনী সহ কিছু বিষয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের সাথে একাকার হয়ে আছে। মাত্র অল্প দিনের দায়িত্বে ও চিন্তা চেতনায় কীভাবে এতসব সম্ভব হয়েছে। ২/৩ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ৭২ এর সংবিধানকে সংশোধন করে বিচারবিভাগের ইতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী সংস্কার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনে ভুমিকা রাখলেন। বিচারপতিদের অভিশংসনের ভার জাতীয় সংসদ নয় বিচারবিভাগের উপর ন্যস্ত রাখলেন। কতটুকু আধুনিক রাষ্ট্রনায়কোচিত চিন্তাচেতনা ছিল যা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে দেশের এই পরিস্হিতিতেও জিয়াউর রহমানের সেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে।

একজন বঙ্গবন্ধুর কিংবদন্তিতুল্য ৩/৪ যুগের আকাশসম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দর্শনের বিপরীতে শহীদ জিয়ার মাত্র ৩/৪ বছরের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনের রাজনীতি এদেশের জনগনের হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে যা আজও রাজনীতির এ চরম দুর্বিসহসময়েও লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী শতসহস্র মামলায় বিপর্যস্ত হওয়ার পরও বটবৃক্ষের মত মাথা উঁচু করে নির্ভিকভাবে দাড়িয়ে রয়েছে তার নিজ হাতে গড়া দল বিএনপি ।

একজন জিয়াউর রহমান মাত্র ৪৫ বছরের ছোট্ট জীবনে এবং কেবলমাত্র ৩/৪ বছরের রাজনৈতিক সময়ে দেশের যেসব আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল একজন ক্ষনজণ্মা পুরুষ হিসেবে ঐশ্বরিক প্রদত্ত বিশেষ কিছু না থাকলে একজন রাজনৈতিক নেতা দ্বারা কিছুতেই সম্ভব ছিলনা।

আজ সেই ক্ষণজণ্মা শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ৩৯তম শাহাদাৎবার্ষিকী। বিনম্র শ্রদ্ধা !

_
এম আমিনুল ইসলাম মুনির
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
adv_aimunir@yahoo.com

Leave a Comment