একজন সফল নারী উদ্যোক্তা জাহান আরা বেগম

ডেস্ক রিপোর্টঃ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা জাহান আরা।

পর্দানশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও, তাঁর সমাজ তার কাজে কখনো বাধা হযনি। পিতা মৌলভী নাসির উদ্দিন ও মাতা সুলতানা রেজিয়া বেগমের সহযোগিতায় কিশোরী বযসে তিনি বাড়িতে গড়ে তোলেন মেয়েদের শিক্ষালয়।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পিতা মাতাদের উদ্বুদ্ধ করতেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে।

কোন কাজকেই তিনি ছোট মনে করতেন না। ছোট বড় সকল কাজেই তিনি সক্রিযভাবে এগিয়ে যেতেন। যাতে অন্য মানুষও কাজের প্রতি উৎসাহী হন। কাজ শেখার প্রতি ছিল তাঁর অফুরন্ত আগ্রহ, কাজ শেখার জন্য ছুটে গেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

অনেক মানুষকে বিভিন্ন কাজ করে দিয়েছেন নতুন একটি কাজ শেখার জন্য। নির্মাণের নেশায় নিজের হাতে বাডীর মসজিদের দেয়ালের ইট গেথেছেন। নিজের বাড়ির ও স্কুলের দেযাল গড়তে নিজেও কাজ করেছেন একজন নির্মাণ শ্রমিকের মতো।

আজীবন কাজ করেও কাজের নেশা থামেনি উনার । অসুস্থ হয়েও হুইল চেযারে বসে মেয়েদের কাজ শিখিয়েছেন। বার্ধক্য ও অসুস্থ্যতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, মানুষ গড়ার এই কারিগর মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত মেয়েদেরকে কাজ শিখিয়েছেন।


বেগমজাহান আরা বেগম তাঁর হস্ত ও কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান “ জাহানারা কটেজ ইন্ড্রাটিজ ” প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫২ সালে কুমিল্লা শহরের নানুয়া’র দীঘির পাড়ে, মাত্র ৭৫ পয়সা পুঁজি নিয়ে , নারীদেরকে ক্ষমতায়িত করার লক্ষে।

তিনি কারো ভাষায় কুটিরশিল্পের অগ্রনায়িকা , কুটির শিল্পের রানী, কারো কাছে দিন বদলের সারথী, কারো কাছে পথ প্রর্দশক, কারো বা কাছে ছোট শিল্পের বড মানুষ, কারো দৃষ্টিতে তিনি মানুষ গড়ার কারিগর।

অথচ সারা দেশের কথা বাদ দিলাম আমাদের কুমিল্লা শহরের বর্তমান প্রজন্মের কয়জনই বা ভালভাবে জানে কুমিল্লার গর্ব বাংলাদেশের জাতীয় এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার “স্বাধীনতা পুরস্কার “ এ ভূষিত এই মহীয়সী নারীটির সম্বন্ধে ।

বাংলাদেশের কুটির শিল্প আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা, সমাজ উন্নয়নকর্মী, জাহানারা কটেজ ইন্ড্রাটিজ এর প্রতিষ্ঠাতা জাহান আরা বেগম। নারীদের ক্ষমতায়িত করার লক্ষে কুটির শিল্পের কাজ শুরু করে পরবর্তীতে এ শিল্পকে তিনি নিয়ে গেছেন বিশ্বের দরবারে। দেশের কুটির শিল্পের বিকাশ ও অগ্রগতিতে তাঁর অসামান্য অবদান সর্বজন স্বীকৃত।

কুমিল্লা শহরের গাংচর এলাকায় জন্মগ্রহণকারী এই মহয়সী নারী ২০১০ সালে ১৭ জানুয়ারী মানবতার তরে অর্পিত দায়িত্ব পালন শেষে ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করেন।

উল্লেখ্য যে দেশী বিদেশি অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কুমিল্লা শহরের নানুয়া’র দীঘির পাড়ে অবস্থিত উনার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান “ জাহানারা কটেজ ইন্ড্রাটিজ ” পরিদর্শন করেছে বিভিন্ন সময়ে।

তাঁর এই মহতী অবদানের জন্য প্রাপ্ত পুরস্কার এবং সম্মানের কথা লিখে শেষ করা যাবে না কয়েক পাতায় ।

কুটির শিল্পের বিকাশ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও পুর্নবাসনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ” স্বাধীনতা পদক ” । ১৯৬২ সালের রানী এলিজাবেথ গর্ভনর স্বর্ণপদক, জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সমবায়ী পুরুস্কার, পল্লী উন্নয়নে শ্রেষ্ঠ কর্ম হিসেবে বার্ড (BARD ) সম্মাননা পদকসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ।
সমাজসেবী ও নারী সংগঠক হিসেবে জীবনে প্রায় ১২৬ টি পদক লাভ করেন তিনি।

তাছাড়া দুঃস্থ ও অসহায় মানুষ বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অসমান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জাহানারা বেগমকে ”সাদা মনের মানুষ” সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
এতগুলো সম্মাননা তিনি গ্রহণ করেছেন নীরবে। এ সম্মাননা তাঁকে করেছে বিনম্র।

স্বশিক্ষায় শিক্ষিত এই মহীয়সী নারী প্রতিষ্ঠান ও কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছেন অবিরামভাবে।
গড়ে তুলেছেন জাহানারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয, জাহানারা কটেজ ইন্ডাষ্টিজ, মনির কটেজ ইন্ডাষ্টিজ এবং ট্রেনিং সেন্টার, শশুর বাড়ির এলাকা বরুড়া উপজেলার আড্ডা গ্রামে; আড্ডা ওমেন্স ইন্ডাষ্ট্রিযাল স্কুল, বজ্রপুর মহিলা সমবায় সমিতি লিঃ, কুমিল্লা সদর (দঃ) কেন্দ্রীয সমবায় সমিতি লিঃ, জাহানারা ফিমেল এডাল্ট স্কুল এন্ড হ্যান্ডিক্রাফটস ট্রেনিং সেন্টার ( JFASAHTC )এর মতো অনেক প্রতিষ্ঠান।

জাহান আরা বেগম বলতেন, মানুষকে শক্তিশালী করতে কর্ম শেখানো এবং কর্মের বিস্তারে জন্য প্রতিষ্ঠান গড়া প্রয়োাজন। আর এই বিশ্বাসকে ধারণ করে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন দুঃস্থ ও অসহায় মানুষ বিশেষ করে নারীদের জীবনকে সাজাতে। অনেক দুঃস্থ ও অসহায় নারীদের হাতকে তিনি পরিণত করেছেন কর্মীর শক্তিশালী হাতে।

জাহানারা কটেজ ইন্ড্রাটিজ নামটি শুনে শিল্প প্রতিষ্ঠান মনে হলেও, মূলত এই প্রতিষ্ঠানে মানুষদের কর্মমুখী শিক্ষা প্রদান করা হয়।
টাকার অংকে এই প্রতিষ্ঠানের মূলধণ স্বল্প হলেও, এই শিল্প প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ লক্ষ কোটিতে।
হাজার হাজার নারী ও পুরুষকে তিনি কর্মক্ষম করেছেন। গড়ে দিয়েছেন জীবন ধারনের পথ। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ মরে যায, মানুষের কর্ম ধ্বংস হয় না।

দেশীয় উপকরণকে যথাযথ সম্পদে রূপান্তরে তাঁর ছিল সিদ্ধ হাত।
একটি বাশের ১২ ইঞ্চি টুকরা হতে তিনি ৬ টি স্কেল, গ্লাস প্লেট এবং টুথপিক তৈরি করতে পারতেন। সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে এ ধরনের অনেক যাদু তিনি শিখিয়েছেন তার অগুনিত শিক্ষার্থীদেরকে।

তিনি বিশ্বাস করতেন অর্থ কোন ব্যাপার নয, প্রয়োজন শুধু চিন্তা, ইচ্ছা ও কাজের মনোবল।

জাহান আরা বেগমের মতে, নারীদের অগ্রগতির জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তবে সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য শিক্ষা নয় বরং নিজকে আলোকিত করে এমন ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন। যে শিক্ষা নারীকে আত্মবিশ্বাসী করে, সে ধরনের কর্মমুখী শিক্ষা।
নারীর বিকাশের জন্য সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

তিনি বলতেন আমি শারিরীকভাবে অসুস্থ কিন্তু আমার মন ও চিন্তা অসুস্থ নয়। আমি মানুষের জন্য চিন্তা করতে পারি।
তিনি বলতেন নেতিবাচক নয় বরং ইতিবাচক ও দিকনির্দেশনামূলকভাবে মানুষের কাজের সর্ম্পকে আলোচনা করা উচিত।

পরিশেষে দোয়া করি মহান আল্লাহ্‌তালায় যেন তাকে বেহস্ত নসীব করেন।

(বিঃ দ্রঃ ধন্যবাদ জানাচ্ছি উনার ছোট ছেলে আমাদের বন্ধু ড.মোহাম্মদ আবুল হাসান (BCS , Admin , যুগ্ন সচিব, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকনমিক কাউন্সিলর) কে, বই এবং তথ্য উপাত্ত দিয়ে আমাকে সহায়তা করার জন্য, হাসানের ছবি সংযুক্ত করে দেয়া হল)

লেখাঃ সংগ্রহীত।

Leave a Comment