এক অন্যরকম ঈদের সাক্ষী আমরা….

আহসান রহমান

প্রতিবছরই দুইটি করে ঈদ আসে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঈদের আনন্দের ঘাটতি হতে থাকে ফি-বছর। যতই নতুন নতুন ঈদ আসুক ছোট্ট বেলার সেই বুঝ হওয়া না-হওয়ার সময়কালের ঈদের মজাটা আর ফেরত আসেনা কখনও। ভোরবেলা বাড়ির সবাই একসাথে মিলে পুকুরে নেমে ঈদ-গোসলের সেই কী আনন্দ! তারপর নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে আতর-খুসবু লাগিয়ে আব্বার পেছনে পেছনে লাইন ধরে সব ভাইদের ঈদগাহে যাত্রা, পেছন পেছন বাড়ির শেষ সীমানা পর্যন্ত আম্মা এগিয়ে দিতে আসতেন এবং হাসিমুখে বিদায় জানাতেন। ঈদগাহে যাওয়ার এই আনন্দ মিছিলটি আমি চিরকালই মিস করে যাবো। ঈদের জামাতে বাবাসহ আমরা সব ভাইয়েরা একসাথে বসতাম। আব্বা আমাদেরকে ফেলে অন্য কাতারে যেতেননা, এমনকি কেউ জোর করলেও সামনের কাতারে যেতেন না। যদি সামনের কাতারে জায়গা পেতাম তাহলে সবাইকে নিয়ে সামনেই বসতেন। সমাজের গণ্যমান্য ও বিদ্যান ব্যাক্তি হিসেবে ঈদগাহ ময়দানে আব্বাকে কিছুক্ষণের জন্য সবার উদ্দেশ্য বলতে হতো যা ছিল সামাজিক ট্র্যাডিশন। উপদেশমূলক আদেশ নির্দেশই থাকতো ঐসব বক্তৃতায় যা সমাজকে কলুষমুক্ত রাখার অভিপ্রায়ে একটি সামাজিক আইনকানুন বিষয়ক আলোচনা। আজকাল তো এই ধরনের আদেশ উপদেশ উঠেই গেছে। যাই হোক, আব্বা সেই বক্তব্য শেষ করে আবার আমাদের সাথে এসে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। এতটা ভালোবাসতেন আমাদেরকে তখন একেবারেই বুঝতামনা। ঈদের নামাজ শেষ করে যথারীতি সর্বপ্রথম আমাদের সাথেই কোলাকুলি করতেন। তখন আমরা কে কার আগে আব্বার সাথে কোলাকুলি করবো তার একটা মানসিক প্রতিযোগিতা তৈরী হতো। তবে বেশিরভাগই আব্বাকে দেখেছি ছোটদেরকে দিয়ে কোলাকুলি শুরু করতেন- সেই হিসেবে আমিই সবার ছোট থাকায় ভাগ্যটা আমারই সুপ্রসন্ন ছিলো। ঈদের নামাজ শেষে আবার একসাথে বাড়ি ফেরা, সেমাই ফিরনী খাওয়া। আমাদের এতটা সামর্থ্য ছিলোনা যে প্রতি বেলায় বেলায় পোলাও কোরমা জর্দা বিরিয়ানি খাবো! তবে ঈদের দিন মোটামুটিরকমের ভালো খাবারের ব্যবস্থাই থাকতো। তবে আমার খাওয়ার প্রতি তেমন কোনো জোঁক ছিলো না তখন। আবার বন্ধু বান্ধবও ছিলোনা যে তাদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়াবো! কিন্তু আমার ছিলো বন্ধু বান্ধবের চেয়েও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কয়েকজন মানুষ- তারা আমার প্রায় সমবয়সী ভাগিনা ভাগ্নী যাদের সাথে খেলাধুলা করেই আমার দিন কেটে যেত। তারা না এলে একা একাই একান্ত মনে খেলতাম। বয়সের বিশাল গ্যাপের কারণে বড় ভাইদের সাথে মেশা হতো না। দুঃখের বিষয় হলো সারাবছর ভাগিনা ভাগ্নিরা আমাদের বাড়িতে অহরহ থাকলেও ঈদের সময় ওরা আমাদের বাড়িতে তেমন একটা থাকতোনা। আসলেও দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতো। তো কি আর করা তাদের অপেক্ষায় ঈদের সকাল দুপুর কাটতো। এরমধ্যে ভেবে ভেবে আকুল হতাম কী কী খেলবো তাদের সাথে…

ঈদের সময় আমাদের ঈদগাহ মাঠে বিশাল মেলা বসতো। কত কী যে ওখানে উঠতো তার ইয়ত্তা নেই। বাচ্চাদের এক বিশাল মিলনমেলা হতো সেটা। আমি শুধু আম্মার কাছ থেকে ঈদ সালামি নিতাম। আর কারো কাছ থেকে চাইতামনা, নিতামও না। সেই সালামি নিয়ে ঐ ঈদ মেলায় গিয়ে কয়েক প্রকারের খেলনা- গাড়ি, ডুগডুগি, লাটিম, বেলুন বাঁশি ইত্যাদি কিনে মজুদ করতাম। বাঁশির সাথে বেলুন গেঁথে সারাদিন ফ্যাঁ ফোঁ বাজাতাম। এখানে বলে রাখি বেলুনগুলো কিন্তু এখনকারগুলোর মত বাচ্চাদের খেলনা বেলুন ছিলোনা যা অবশ্য বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি! এগুলো ছিলো বড়দের জন্যে বানানো তৈলাক্ত পাতলা বেলুন, তবে বেলুনগুলো ফুলালে অনেক বড় হতো- এখন বুঝি তার কারণ হলো ইলাস্টিসিটি!

যাক আমার সমস্ত খেলনা রেডি হয়ে যেতো দুপুর নাগাদ; ভাগিনা ভাগ্নিরা এলেই কেবল খেলা শুরু করা যায় এমন অবস্থা। অবশেষে তারা আসতো আর আমাদের আমোদ ফুর্তি শুরু হয়ে যেতো- তখনই মনে হতো আসল ঈদ শুরু হয়েছে আমার মনে।

এখন আর সেই ঈদ মনের মধ্যে আসেনা, তাই ঈদের আনন্দও পাইনা।
বাবা-মা চিরদিনের জন্য চলে গিয়েছেন- এয়াতীমের আবার কিসের ঈদ!!! ভাইবোনেরা শিক্ষিত হতে হতে ভাইবোনদের প্রতি মায়া মহব্বত ভালোবাসা ভুলে গেছেন, ভাগিনা ভাগ্নিরা প্রতিষ্ঠিত হতে হতে আত্মীয়তার বন্ধন ভুলে খেয়েছে। তাই ঈদও মাটি হয়েছে আমার জীবনে। তার উপরে বিষফোঁড়া হয়ে এবার এলো করোনা। যেখানে ঈদের নামাজই হয়তো পড়া দায় সেখানে আর কী-বা ঈদ কী-বা আনন্দ। পাড়ার মুরুব্বি ও বন্ধুদের সাথে দেখা হলে মোলাকাত করতাম। এবার তাও বন্ধ- কারো সাথে কোলাকুলি করা যাবেনা, হাতে হাত রেখে কথাও বলা যাবেনা দূরত্ব বজায় রেখে থাকতে হবে- যাকে বলা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব! ঠিকই আছে, বলেন তো করোনা ছাড়াও আমরা কতটা সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম? এই সামাজিক দূরত্ব কিন্তু আমরাই আমাদের অবচেতন মনের গভীরে তৈরি করে রেখেছিলাম আগেই যা করোনার মাধ্যমে স্বয়ং আল্লাহ বাস্তবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ সবাইকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করুক-আমীন।

সবার হৃদয়ে ঈদ আসুক প্রাণবন্ত হয়ে। যদিও এবারের ঈদ করোনাক্রান্ত, তবুও পারিবারিক বন্ধনে অটুট থাকুক ঈদ আনন্দ। না-হয় একটি অন্যরকম ঈদের সাক্ষী হয়েই থাকলাম! এই পরিস্থিতির উত্তরণের লক্ষ্যে সবাই সবার জন্য দোয়া করি।

💖ঈদ মোবারক💖

লেখকঃ আহসান রহমান।

Leave a Comment