পুলিশের গুলিতে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা নিহত, বিচার বিভাগীয় হত্যার তদন্তে আইনি নোটিশ

টেকনাফে পুলিশের গুলিতে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খান নিহত হওয়া ঘটনার বিষয়টির প্রকৃত তথ্য উদঘাটন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনে স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইন সচিবকে আইনি নোটিশ প্রদান করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি, ন্যাশনাল ‘ল’ ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এড. জুলফিকার আলী জুনু।
আইনি নোটিশে তিনি জানান, জাতীয় পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারি যে, দেশের একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা পুলিশের গুলিতে বিচার বহির্ভুত হত্যার শিকার হয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য, শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে সিনহা রাশেদ খান নিহত হন। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এদিন সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে অপর এক সঙ্গীসহ টেকনাফ থেকে কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া চেকপোস্টে পুলিশ গড়িটি থামিয়ে তল্লাশি করতে চাইলে সেনা কর্মকর্তা বাধা দেন। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে সেনা কর্মকর্তা তার কাছে থাকা পিস্তল বের করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান গুরুতর আহত হন। পরে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার সকালে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
পত্রিকার ভাষ্যমতে এবং নিহত মেজর(অব:) সিনহা মো: রাশেদ খানের সামাজিক মর্যাদা ও পুর্ববর্তী জীবন বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। তার বিরুদ্ধে পুলিশ কর্তৃক যে অভিযোগ এনে গুলি করা হয়েছে যা দেশের বিশিষ্টজনের চোখে কাল্পনিক এবং পুলিশ কর্তৃক গুলি চালানোর কিছু আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে যাহা নি¤œরুপ- আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার একটি চড়ান্ত ব্যবস্থা। পিআরবি ১৫১ বিধি অনুসারে ঘটনাস্থলে ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকলে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশেই অধিনায়ক পুলিশ অফিসার আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহারের গুলি বর্ষণ করার আদেশ দিতে পারেন।

পিআরবি ১৫৩ বিধি অনুযায়ী নিম্নলিখত পরিস্থিতিতে একজন পুলিশ অফিসার আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেনঃ
১। ১৮৬০ সালে প্রণীত পেনাল কোডের ৯৯ ধারার শর্ত সাপেক্ষে পেনাল কোডের ৯৬, ৯৭, ৯৮, ১০০, ১০৩, ১০৪, ১০৬ ধারা অনুসারে নিজের জানমাল ও অপরের জানমাল এবং সরকারি সম্পত্তির যে কোনো প্রকার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার প্রয়োগকালে পুলিশ অফিসার আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।
২। ১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌঃ কাঃ আইনের ৪৬(৩) উপধারা মোতাবেক মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার সময় বা তার গ্রেফতার কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুলিশ অফিসার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।
৩। ফৌঃ কাঃ ১২৭, ১২৮ ধারা অনুযায়ী কোনো বেআইনী সমাবেশ/দাঙ্গা হাঙ্গামা ছত্রভঙ্গ করার জন্য বা তাদের মারাত্মক ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ রোধকল্পে পুলিশ অফিসার আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।
৪। ১৮৬১ সালে প্রণীত পুলিশ আইনের ৩০ ধারার অধীন প্রদত্ত লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে কোনো মিছিল মিটিং বা জনসমাবেশ বা শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হলে, এরুপ মিছিল বা জনসমাবেশ বা শোভাযাত্রাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ অফিসার আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। [পেনাল কোড ১৪১, ১৪৩ ধারা, পুলিশ আইনের ৩০-ক(১)(২) ধারা]

এছাড়াও পিআরবি ৬৯৫ বিধি অনুসারে ট্রেজারী গার্ড ডিউটি করার সময় যে কোন দুস্কৃতিকারীর প্রতি এবং পিআরবি ৭০৩ বিধি অনুসারে আসামির স্কর্ট ডিউটি করাকালে অসামী পলায়ন করলে বা আসামীকে ছিনাইয়া নেওয়ার চেষ্টাকালে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। [পিআরবি ১৫২, ১৫৩, ১৫৪, ১৫৫ বিধি]

পিআরবি ১৫৬ বিধি অনুযায়ী আগ্নোয়াস্ত্র ব্যবহার করার পর পুলিশ অফিসারের করণীয়ঃ
১। আহতদের হাসপাতালে প্রেরণ করবেন। (পিআরবি ৩১২, ৩২১ বিধি)
২। নিহতদের মর্গে প্রেরণ করবেন।(পিআরবি ৩০৪, ৩০৫ বিধি)
৩। কার্তুজের খোসাগুলি সংগ্রহ করে ইস্যুকৃৃত গুলির রাউন্ডের সাথে মিলাবেন।
৪। ঘটনা সম্পর্কে প্রথমে সংক্ষিপ্ত রির্পোট দিবেন পরে বিস্তারিত রির্পোট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করবেন। (ফৌঃ ১৫০ ধারা ও পিআরবি ১২০ বিধি)
৫। পুলিশ অফিসার গুলি করার পরে পুলিশ সুপার, ডিআইজি ও আইজিপি মহোদয় বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠাবেন। (পিআরবি-১৫৬ বিধি)।

অতএব, মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খানের উপর পুলিশ কর্তৃক গুলি চালিয়ে হত্যার সময় পুলিশ কর্তৃক আরোপিত আগেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিধি নিয়ম অনুসরন করা হয়েছে কিনা? নাকি অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তাহার একটি নিরপেক্ষ সুষ্ঠ তদন্ত ও ঘটনার মূল রহস্য জনস্বার্থে ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার কর্তৃক প্রকাশ করা উচিৎ। সুতরাং সুষ্ঠ নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বিচার বিভাগীয় হওয়া উচিৎ। বিচার বিভাগীয় তদন্ত দেশ ও জাতির কাছে বিশ্বাসযাগ্য।

অতএব পুলিশ কর্তৃক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খানেক গুলি করে নিহত করার ঘটনার বিষয়ে সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের অনুরোধ জানাচ্ছি। অন্যথায় জনস্বার্থে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি এড. জুলফিকার আলী জুনু।

Leave a Comment