রুবী শামসুন নাহার এর এক গুচ্ছ কবিতা।

প্রহর

পাটভাঙা রোদ্দুর দোলা দেয়

ডাকিনীর শরীরে,

কত তার বয়স ষাট না সত্তর?

মাঝরাতে ডাকে চৌরঙ্গী হাঁস,

নিরব হাওয়া গুনগুনায়।

শংকার মালা গাঁথে বকুল হৃদয়।

হরিয়াল খোঁজে খৈরি বিতান

“গাওদিয়ার কুসুম”

আর একবার জাগে “শশীর”

চেতনা যদি আসে।

 

 

পরিচয়

দেখা হলে কি আর হতো

খুব জোর কফি,

একসাথে কফি পান করতে চাইতে!

আমি খুঁজে খুঁজে

একটা অপরিচিত কফি শপে বসতাম!

আমাকে কফি অর্ডার করতে বলতে

আমি কিছুতেই তোমাকে তোমার পছন্দের কফি কি জানতে চাইতাম না।

আমি কম দামের কফিটাই অর্ডার করতাম।

কারণ দামটাতো আমি তোমার কাছ থেকে নেবনা।

কফি পান করতে করতে ভাবতাম বেশ দোসা আর ক্যাশো নাট সালাদ খেয়ে ফেলতাম,এই পয়সায়-

সেখানে কফি??

ক্যাবে করে এসেছি কড়কড়ে টাকা গুণে

ফিরবও সেভাবে।

গরীবের কিছু ঘোড়ারোগ থাকে আমারও আছে।

হয়তো তোমার একদিন খুব ইচ্ছে হবে

পুরানো শহর ঘুরে দেখার,

মাওয়ায় যেয়ে পদ্মার ইলিশ খাওয়ার।

আমি সংসারে কেমন লেজেগোবরে আটকে গেছি ভেবে করুণা হবে তোমার,

ভাববে, যাকে চিনতাম, সেকি এই?

না দেখা না জানাই ভালই ছিলো

আর আমি সব থেকে সুখ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করবো,

ভাববো ও আমার অতিথি।

তুমি সম্প্রতি ইজিপ্ট ঘুরে এসেছ,

এই সামারে প্যারিসে এক বান্ধবীর সাথে

স্যামন আর এস পারগাছ খেয়েছ

তারই গল্প মশগুল হয়ে শুনবো।

স্যামনের এখনকার মূল্য ও স্বাদে কেমন

জানতে চাইব।

কিছুতেই দারিদ্রের ঢে্ঁকুর তুলবনা-

বরং আমারও এক এক বন্ধুর গল্প শোনাব- সুইজারল্যান্ড থেকে এসেছিল আমার সাথে শীতলক্ষ্যার নদীতে বোটে বসে চাঁদ দেখবে বলে,

ওখানেই নাকি ভরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যায়।

আত্মীয় স্বজনের ভিড়ে ও ঢাকার যানজটে

তার সেসব ইচ্ছে উবে গিয়েছিল।

আমার মতন করে বেঁচে আছি আমি,

আমাকে জানতে চেয়ে

কি আর পাবে তুমি?

 

 

মৃত্যু

মনে কর তুমি ভোজনশালায় ছিলে

আমার মৃত্যু সংবাদ পেলে!

তোমারা কয়েকজন একত্রিত হয়েছিলে,

বিভিন্ন বিমানের আদর পরিচর্যা নিয়ে

জেটলগ না ছুটিয়েই চলে এসেছিলে!

তোমারা কি একসাথে শোক প্রকাশ করবে?

আলাদা করে ওয়াশরুমে চলে যাবে?

কিংবা ব্যালকনির ফাঁকে চোখের জল ফেলবে!

কারণ আমি তোমাদের অন্তরের অন্তস্থলে

ডুবেছিলাম সবুজ ঘাসের মত,

সজীব নিঃশ্বাসের মত।

বা একটুকরো কবিতার মতো,

বা সুপ্ত লাভার মতো যখন ইচ্ছে গলে বের করতে পারতে।

কিংবা ধরো কোন অলস দুপুর

বা কনকনে শীতের রাতে তোমার পাশে

ছায়া হয়েছিলাম।

বা তোমার ডায়েরিতে শুকনো গোলাপের কলি।

দিতেতো চেয়েছিলে দেয়া হয়নি,

ওগুলো গোলাপের পাপড়ি বলে

আজ আর চেনা যায়না!

হয়তো একটু বেশিই ভাবছি,

বি্এম,কলেজ ৭৮, র আবেগি যুবকদের মহামিলনের মত কলকলিয়ে উঠছি।

জানি সংসারে স্ত্রী যখন সব দখল করে নেয়

তখন প্রেমের বাষ্প খুব বেশিক্ষণ থাকে না।

বউ নিত্য অভ্যাস, প্রেমিকা নিঃশ্বাস।

আসলে আমি তো কারও প্রেমই ছিলামনা,

শুধু মনের কোণে গুণগুনিয়ে ওঠা

একটু কলি বা বুকের গভীরে

নিঃশব্দ ঠাণ্ডা স্রোত!

যেটা জানতে চেয়েছিলাম তুমি কি একাই চোখের জল ফেলবে?

নাহ! সবাই একসাথে শোক করবে?

আমি প্রেমিকার মতো কারও মৃত্যুতে

অনেক মন খারাপ ও দিনটি মলিনভাবে কাটাতে দেখার সাক্ষী।

তুমি বা তোমরা কিভাবে কাটাবে দিনটা?

অবশ্যি বন্ধুরা মরে যাবার পর আমি এসব জানতে পারবনা

মনুষ্য জন্মতো একবারই হয়?

রুবী শামসুন নাহার।