স্বপ্ন মরে যায়

– কামরুজ্জামান বাবু

কোন মধ্যবিত্ত পরিবারের উদ্বুদ্ধ বাবা-মায়ের এমন এক অপদার্থ, অকর্মন্য, অসহায়ত্ব নিয়ে জন্মালে, একজন -যারা প্রতিনিয়ত খেলা করে,আমি পারিনা আমার অপারগতা প্রকাশ করতে। আমার বাবাও পারেননি কিন্তু ক্ষুদ্র একটা চাকরিতে আমাদের পরিবারের ঘানি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন অনবরত আর সেটা আমি কলেজ লাইফে এসে টের পাই, বাবার যৎসামান্য আয়ের আমাদের পরিবারের ছয়জনের সংসার চলে, মোদ্দাকথা যেভাবেই হোক চলে যাচ্ছে। আগে যেমন যেতো।

বাবার একটাই কথা, “বাবা, আমার চামড়াও যদি বিক্রি করতে হয়, তোমাদের মানুষ করে তোলাই আমার কর্তব্য। আমি গোপনে বাবার চোখ টলমল দেখেছিলাম বহুবার। আমিও আমার গোপন চোখের জল আড়াল করেছি দিনের পর দিন। আমার মা যেন আজ নির্বাক মূর্তির মতো আমাদের অবলোকন করেন। মা আমার একমাত্র বন্ধু, যার সাথে আমি শেয়ার করতে পারি সবকিছু, তৃপ্ত বোধ করি আর বাকি তিন ভাইবোনকে কিছুই বুঝতে দিচ্ছি না আপাতত।

আমি ইন্টারমিডিয়েট থেকেই ছাত্র-ছাত্রী পড়াই, বাবা জানেন না। সাধারণত নিম্নমধ্যবিত্তদের ইগো প্রবলেমটা অনেক বেশি থাকে কিনা! আমার মা আমার এমন কোন কার্যকলাপ নেই, যা জানেন না। আমার অর্জিত টাকাটা একটা মোটা অংশ মায়ের কাছেই রেখে দেই। আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্য, এই টাকাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আমার বাবা একটা কথাই বলেছেন, “বাবা আমি লজ্জিত তোমার ভর্তির টাকাটাও দিতে পারিনি, তবে আমি আপ্রান চেষ্টা করে যাব, আমার চামড়া, রক্ত বিক্রি করে হলেও তোমায় পড়ালেখার কোনরকম যেন ক্ষতি না হয়।

আমি বলেছিলাম, “বাবা বিশ্বাস রাখো আমার”। মা এমন একটা ব্যাংক, যার কাছে কিছু টাকা রাখলে তা মাসে সেই দ্বিগুণের মতো হয়ে যায় প্রায়। আমার বুঝার বাকি থাকে না, ওখানে মা-ই কষ্ট করে জমানো টাকাগুলো আমার টাকাগুলো সাথে রেখে দেন।

আমি যখন ভার্সিটিতে ভর্তি হই, আমার ভাগ্য প্রসন্ন ছিল। এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটা কোচিং সেন্টারে পড়ানোর সুযোগ হয়। আমি আমার অধ্যবসায় দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি যাতে আমি আমার সর্বোচ্চটা দিতে পারি। আমাকে যা সম্মানী দেয়, তার থেকে ভালো হবে ভেবে বাবাকে না জানিয়ে মায়ের কাছে পাঠাই।পাছে এটাও চিন্তা করি, বাবা না আবার কষ্ট পায়!
যদি সংসারে কোন অবদান রাখতে পারি -এই ভেবে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। আমার বাবা আমাকে সেই ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছেন,” কারো কাছে বা কারো সামনে তোমার দুহাত প্রসারিত করো না যতই কষ্ট হোক। দু’হাত প্রসারিত করো উপরওয়ালার কাছে কিছু চাইতে অথবা নিচু করো যেকোনো এক হাতের আঙ্গুলগুলো মুষ্ঠিবদ্ধ করো অন্তত কাউকে নীরবে কিছু দিতে”।

আমি আর হলে থাকতে পারছি না। যখন আমাদের দেশে করোনার প্রকোপ যাত্রা শুরু করলো, বাবা-মায়ের চিৎকার কান্না এবং অনেকটা তাদের সর্বোচ্চ আবেগের বসেই আমাকে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হয়েছিল। কোচিং সেন্টার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন -পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কিছু ভাবা যাচ্ছে না। আমার সংসারে ছোট ভাইবোনগুলো প্রতীক্ষায় থাকে, ভাই আসবে, আমাদের মত করে চাহিদা পূরণ করবে, কিন্তু পারছিনা। অগত্যা মা-বাবার কথামতো মত আমাকে বাড়ি চলে আসতেই হয় এবং বাড়িতে এসে কোচিং এর বড় ভাইদের ফোনে ফোন দিলেও তারা ধরছেন না। কি হয়েছে, এর জন্য আমি আমার আমি, আমার মা-বাবার কাঁধে চড়ে বসি।

গভীর রাতে বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাদেন, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আমি পাথর চাপা বুকে সহ্য করে বাবাকে সান্ত্বনা দিই। টিউশনির বাসায় ফোন করে আমার বকেয়া সম্মানী চাইলে আমাকে লজ্জিত হতে হয় আমার সংসারে বাবার, এর পাশাপাশি আমার এই ক্ষুদ্র আয় মিলেও জীবন যাপন করছি আদিম যুগের মত কিন্তু আমার ম্যাজিকেল মা সবকিছু সামলে নেন।

আজ এই মনেতে, মহামারীতে আমার ভেতর কুঁকড়ে যায় পরে। কবে ঠিক হবে আমি আর কিছুই নিতে পারছিনা। বাবা-মায়ের মিথ্যে হাসি আমার চোখ এড়ায় না। আমি লুকিয়ে তাদের দিকে তাকাই। আমার মায়ের চোখের জলে আমার অন্তরাত্মা স্যাঁতসেতে হয়ে যায়, বাবা অভিনয় লুকিয়ে চোখ মুছে আর আমাকে অভিনয় করতে হয় সামগ্রিক প্রতিক্রিয়ার বীজ বপন করে।

আমি শুধু ভুলতে পারিনা, আমি কপর্দকশূন্য বিমর্ষিত বিশ্বাস নিয়ে চলে যাওয়া সামনের দিনগুলোতে বুঝিবা আমি অপদার্থ এক সন্তানের মতোই বেঁচে থাকবো। বিত্তবান, মধ্যবিত্তবান – তার আরেকটা পাশ নিম্নমধ্যবিত্ত। এই মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের যে ক্লেশ, সেগুলো আমরা কখনোই কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনা। প্রয়োজনে একবেলা খেয়ে থাকি, আমরা কখনোই অন্যের দিকে হাত পাততে পারিনা। আমরা ত্রাণ নিতে পারিনা, আমরা আমাদের সংসার কে সচল করার জন্য অন্য কোন পথ অবলম্বন করতে পারিনা। আমাদের যা আছে -তা দিয়েই কোনরকমে একবেলা, দুবেলা খেয়ে যাই কিন্তু আমার মাথায় একটাই প্রশ্ন করাঘাত এর মত আত্মা বিদ্ধ করে, আমি কি করবো -সেটা আদৌ বুঝতে পারছিনা।

পরিস্থিতি কবেই বা শান্ত হবে, সেটাও জানি না তবে আমার প্রয়োজন পরিস্থিতি শান্ত হওয়া আর আমার প্রয়োজন, আমাকে আবার আমার পরিবারের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে (আমার বাবাকে ছোট করার উদ্দেশ্য নয়) বরং আমি এজন্যই আমার বাবার সাথে এই ব্যাপার গুলো শেয়ার করিনি কারণ আমাদের পরিবারের নয়নমণি যে কিনা তুড়ি মেরে জোরে জোরে সমস্যা গুলোকে সমাধান করার চেষ্টা করেন কিন্তু আমার ভেতরের যেই কষ্টগুলো সেই কষ্টগুলো মুছে ফেলার জন্য আর কোনো উপায়ান্তর দেখছে কিন্তু এটা বেশ বুঝতে পারছি। আমার বাঁচা দরকার, আমার পরিবারের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে এটাই আমি উপলব্ধি করতে পারছি।

আমাকে প্রয়োজনে আবার ফিরে যেতে হবে, আমাকে কাজ খুঁজতে হবে। বাবার সেই শুভ্র শরীর ধীরে ধীরে রোদ ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তার অবয়ব পাল্টে গেছে প্রায় কিন্তু আমি সেটা চাইনি। আমি চেয়েছিলাম আমার মা-বাবা, ভাই-বোনেরা ভালো থাকুক। আমি আজ অসহায় চিত্তে একটা জিনিসই ভাবছি, আমি কি আদৌ একজন উপযুক্ত সন্তান? আমার আক্ষেপ একটাই, এই আক্ষেপটা প্রশ্নবানে আমার আত্মাকে ছুঁড়ে দেয়, আমার কিছু একটা করা প্রয়োজন আর এই প্রয়োজনের খাতিরে আর যাই হোক, বেঁচে থাকি কিংবা মরে যাই তাতে আপত্তি নেই। এইভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে আমার কর্মচাঞ্চল্য দিনগুলোকে সজীব করতে হবে।

আমি জানিনা, সেটাও যে কিভাবে কি করতে হবে। আমি দীঘল বৃক্ষের ছায়াতলে, জলে আমার প্রতিবিম্ব দেখি আর ভাবি আমার কি করা উচিত। আমার ভাবনারা সাড়া দেয় না, আমার অক্ষমতা। আমার প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিউরনে ক্রমাগত অনুরণন হতে থাকে, আমার কী করা উচিত!

আমি জানিনা তবে এটাই জানি আমাকে একটা কিছু করতে হবে কারণ আমার বাবার ঘাম ঘামে ভেজা শার্ট, তার কষ্ট, মা তার সারাক্ষণ সমস্ত পরিবারের চিন্তাভাবনাগুলোকে সযত্নে লালন পালন করে ভেতরে হাসফাস করিয়ে যাচ্ছেন নিজেকেই কিন্তু আমাদেরকে কিছুই বুঝতে দিচ্ছেন না। আমার ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করে, আমি আর কিছু চাই না। শুধু আমার অপরাধ বোধ মুছে যাক।

লেখকঃ কবি ও শিক্ষক

Leave a Comment